শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষাদান: রাষ্ট্রীয় প্রশাসক হিসেবে শিক্ষকদের ভূমিকা এবং শিক্ষা ব্যবস্থার ওপর এর প্রভাব
![]() |
| প্রশাসনিক কাজের চাপে লাটে উঠেছে স্কুলের পড়াশোনা!" — শিক্ষকদের এই সংকট ও অ-শিক্ষামূলক কাজের প্রতিবাদের ছবি। |
পশ্চিমবঙ্গের প্রেক্ষাপট:
এসআইআর (SIR) এবং অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার প্রকল্প, পশ্চিমবঙ্গে ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন বা 'স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন' (SIR) প্রক্রিয়ার জন্য শিক্ষকদের বুথ লেভেল অফিসার (BLO) হিসেবে নিয়োগ করা হয়েছিল। এই কাজের পর বর্তমানে নবনির্বাচিত সরকার শিক্ষকদের 'অন্নপূর্ণা ভাণ্ডার' (যা পূর্বতন লক্ষ্মীর ভাণ্ডার প্রকল্পের পরিবর্তিত রূপ) প্রকল্পের জন্য 'ফিল্ড ইমপ্লিমেন্টেশন অফিসার' হিসেবে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে ।
শিক্ষক নিয়োগে বিলম্ব, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং শিক্ষকদের ন্যায্য সুবিধা না পাওয়া নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়। - অনুপম রায়, এবিটিএ কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য।এই নতুন দায়িত্বের আওতায় শিক্ষকদের ফর্ম ডাউনলোড করা, বাসিন্দাদের ফর্ম পূরণে সাহায্য করা, নথিপত্র যাচাই করা এবং আবেদনকারীরা যোগ্য কিনা তা নির্ধারণের জন্য বাড়ি বাড়ি গিয়ে পরিদর্শন (home visits) করতে হয়েছে। অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষকদের অভিযোগ যে, তাদের প্রথমার্ধে স্কুলের কাজ করতে বাধ্য করা হচ্ছে এবং দ্বিতীয়ার্ধে বিএলও (BLO) ডিউটির জন্য বাইরে যেতে হচ্ছে, যা তাদের ওপর চরম কাজের চাপ সৃষ্টি করছে।
শিক্ষা ও শিক্ষার্থীদের ওপর প্রভাব প্রশাসনিক কাজের এই চাপ সরাসরি স্কুলের শিক্ষার গুণগত মানকে প্রভাবিত করছে:
- শিক্ষক অনুপস্থিতি ও শ্রেণির সংমিশ্রণ: প্রশাসনিক কাজের কারণে শিক্ষকরা প্রায়ই শ্রেণিকক্ষে অনুপস্থিত থাকেন। এর ফলে বাধ্য হয়ে বিভিন্ন শ্রেণির শিক্ষার্থীদের একসাথে বসিয়ে পড়ানো হচ্ছে [৩]।
- পাঠদানের ধারাবাহিকতা নষ্ট: দীর্ঘ সময় ধরে অ-শিক্ষামূলক কাজে ব্যস্ত থাকার ফলে শিক্ষকরা পাঠ পরিকল্পনা করতে বা পাঠদানের ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে পারছেন না।
- শিক্ষার্থীদের ক্ষতি: বিশেষ করে প্রাথমিক স্তরে এর প্রভাব সবচেয়ে বেশি। অনেক ক্ষেত্রে প্রশাসনিক কাজ শেষ না হওয়া পর্যন্ত শিক্ষকদের স্কুল ছুটি দিতে হচ্ছে, যার ফলে শিক্ষার্থীরা পাঠদান থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।
আইনি ও সাংবিধানিক দৃষ্টিভঙ্গি
ভারতের সংবিধানে শিশুদের বিনামূল্যে এবং বাধ্যতামূলক শিক্ষার অধিকার আইন (RTE Act), ২০০৯ অনুযায়ী, শিক্ষকদের কেবল জনগণনা, দুর্যোগ মোকাবিলা এবং পঞ্চায়েত, বিধানসভা বা লোকসভা নির্বাচনের কাজ ছাড়া অন্য কোনো অ-শিক্ষামূলক কাজে মোতায়েন করা নিষিদ্ধ। সুপ্রিম কোর্টও এক রায়ে জানিয়েছে যে, শিক্ষকদের অ-শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহার করা অসাংবিধানিক।
শিক্ষক ইউনিয়ন ও শিক্ষকদের ক্ষোভ
পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন শিক্ষক সংগঠন, যেমন নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি (ABTA) এবং শিক্ষানুরাগী ঐক্য মঞ্চ, শিক্ষকদের এই প্রশাসনিক কাজে ব্যবহারের তীব্র প্রতিবাদ জানিয়েছে। শিক্ষকদের দাবি, তারা বি.এড (B.Ed) ডিগ্রি অর্জন করেছেন এবং শিক্ষক যোগ্যতা পরীক্ষা (TET) উত্তীর্ণ হয়েছেন শিক্ষকতা করার জন্য, সরকারি প্রকল্পের ফর্ম পূরণ বা যাচাইকরণের জন্য নয়। এছাড়া এসআইআর (SIR) কাজের সম্পূর্ণ পারিশ্রমিক না পাওয়া এবং ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়ার কারণে গ্রামবাসীদের সাথে শিক্ষকদের সম্পর্কের অবনতি ঘটাও তাদের অসন্তোষের অন্যতম কারণ।
ABTA-র কেন্দ্রীয় কমিটির নেতা ও দক্ষিণ ২৪ পরগনা জেলা কমিটির সম্পাদক অনুপম রায় বলেন:
“শিক্ষক নিয়োগে বিলম্ব, অবকাঠামোগত ঘাটতি এবং শিক্ষকদের ন্যায্য সুবিধা না পাওয়া নিয়ে অসন্তোষ বাড়ছে। শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নয়ন ছাড়া সমাজের অগ্রগতি সম্ভব নয়।”
শিক্ষকদের প্রাথমিক ভূমিকা হলো শিক্ষাদান। প্রশাসনিক বোঝার কারণে তৈরি হওয়া শিক্ষক অনুপস্থিতি শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদি শিক্ষকদের ক্রমাগত অ-শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহার করা হয়, তবে শিক্ষার্থীদের শিক্ষার অধিকার এবং উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ উভয়ই প্রশ্নের মুখে পড়বে। তাই শিক্ষা ব্যবস্থার উন্নতির জন্য শিক্ষকদের প্রশাসনিক চাপ থেকে মুক্ত করে শ্রেণিকক্ষে ফিরিয়ে আনা জরুরি।

