অযৌক্তিক টেট-নির্দেশের প্রতিবাদে কলকাতায় শিক্ষকদের বিশাল যৌথ মিছিল ও প্রতিবাদ সমাবেশ
![]() |
| কলকাতার রাজপথে সুপ্রিম কোর্টের টেট-নির্দেশের প্রতিবাদে বামপন্থী শিক্ষক সংগঠনগুলোর বিশাল যৌথ মিছিল ও সমাবেশ। |
নিজস্ব প্রতিনিধি, কলকাতা: সুপ্রিম কোর্টের টেট (TET) সংক্রান্ত সাম্প্রতিক নির্দেশের প্রতিবাদে এবং কর্মরত শিক্ষকদের চাকরির সুরক্ষার দাবিতে আজ কলকাতার রাজপথে আছড়ে পড়ল হাজার হাজার শিক্ষকের প্রতিবাদী মিছিল। সুবোধ মল্লিক স্কোয়ার থেকে কলেজ স্ট্রিট পর্যন্ত আয়োজিত এই বিশাল যৌথ মিছিলে শামিল হয়েছিলেন এবিটিএ (ABTA), এবিপিটিএ (ABPTA) সহ বিভিন্ন বামপন্থী শিক্ষক সংগঠনের সদস্যবৃন্দ। মিছিল শেষে আয়োজিত প্রতিবাদ সমাবেশে বক্তারা কেন্দ্রীয় ও রাজ্য সরকারের শিক্ষানীতি এবং আদালতের নির্দেশের তীব্র সমালোচনা করেন।
উল্লেখ্য, সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী দেশের সমস্ত কর্মরত প্রাথমিক ও উচ্চ-প্রাথমিক শিক্ষকদের জন্য টেট পরীক্ষা দেওয়া বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। যদিও গত বছর আদালত ২০২৭ সাল পর্যন্ত সময়সীমা দিয়েছিল, কিন্তু চলতি বছরে সেই সময়সীমা আরও এক বছর বাড়িয়ে (২০২৮ সালের ৩১শে আগস্টের মধ্যে) রায় বহাল রাখা হয়েছে। শিক্ষকদের প্রধান প্রশ্ন হলো, দীর্ঘ সময় শিক্ষকতা করার পর এখন নতুন করে যোগ্যতার পরীক্ষা দেওয়ার যৌক্তিকতা কী? যখন তাঁরা নিয়োগ পেয়েছিলেন, তখন টেট-এর মতো কোনও নিয়ম চালু ছিল না। এই সিদ্ধান্তের ফলে রাজ্য তথা সারা দেশের লক্ষ লক্ষ শিক্ষক চরম সংকটের মুখে পড়েছেন।
এছাড়া সমাবেশে শিক্ষকদের অ-শিক্ষামূলক কাজে ব্যবহার, বেতন বৈষম্য এবং কেন্দ্রীয় পরীক্ষার প্রশ্ন ফাঁসের মতো বিষয়গুলোও উঠে আসে।
২০০৯ সালের শিক্ষার অধিকার আইনে যা বলা হয়নি, এখন সেই ফতোয়া শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কর্মরত শিক্ষকদের ওপর নতুন করে ৬০% নম্বর পাওয়ার শর্ত চাপানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। -- সুজিত দাস, সাধারণ সম্পাদক, এবিটিএ
নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতির সাধারণ সম্পাদক বলেন, "২০০৯ সালের শিক্ষার অধিকার আইনে যা বলা হয়নি, এখন সেই ফতোয়া শিক্ষকদের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কর্মরত শিক্ষকদের ওপর নতুন করে ৬০% নম্বর পাওয়ার শর্ত চাপানো কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না। একদিকে কেন্দ্রীয় শিক্ষামন্ত্রীর অধীনে থাকা এনটিএ (NTA)-র মাধ্যমে নিট (NEET) বা নেটের (NET) মতো পরীক্ষায় ৮৯ বার প্রশ্ন ফাঁস হচ্ছে, অন্যদিকে অভিজ্ঞ শিক্ষকদের বারবার পরীক্ষা দিতে বাধ্য করা হচ্ছে। আমাদের দাবি, আগামী ২২শে জুন বিধানসভা অধিবেশনে বিল পাস করে এই টেট ফতোয়া পশ্চিমবঙ্গে বন্ধ করতে হবে এবং কেন্দ্রকে অর্ডিন্যান্স জারি করতে বাধ্য করতে হবে।
নিখিল বঙ্গ প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি পক্ষ থেকে দাবি করা হয় "পশ্চিমবঙ্গের টেট সমস্যা সারা দেশের থেকে আলাদা। এখানে ২৮০০-র বেশি শিক্ষক আছেন যারা এক বছরের পিটিআই (PTI) প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং অনেকের নিয়োগ হয়েছিল শুধুমাত্র মাধ্যমিক পাসের ভিত্তিতে। বর্তমান আইনের প্যাঁচে তাঁদের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত। আমরা পরিষ্কার জানিয়ে দিচ্ছি, একজন শিক্ষকের চাকরিও যদি যায়, তবে আমরা তা হতে দেব না। আগামী ১৯শে জুন ধর্মতলায় আমরা বৃহত্তর অবস্থান কর্মসূচি পালন করব এবং সরকারের প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের বিরুদ্ধে আমাদের লড়াই চলবে।"
আগে জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে বাজেটের আগে শিক্ষক সংগঠনগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করা হতো, কিন্তু বর্তমান সরকারের সেই নৈতিকতা নেই। -- সুজন চক্রবর্তী
বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ ও বামপন্থী সমাজকর্মী ড. সুজন চক্রবর্তী বলেন, "আগে জ্যোতি বসু বা বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের আমলে বাজেটের আগে শিক্ষক সংগঠনগুলোর সঙ্গে পরামর্শ করা হতো, কিন্তু বর্তমান সরকারের সেই নৈতিকতা নেই। রাজনীতির মূল্যবোধ আজ হারিয়ে গেছে; নেতারা কেবল দলবদল আর দুর্নীতির ধান্দায় ব্যস্ত। শিক্ষকরা যেখানে সমাজকে নৈতিকতার শিক্ষা দেন, সেখানে সরকার তাঁদেরই বিপন্ন করে তুলছে। আমরা আশা করি সরকার তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করবে, অন্যথায় মানুষ এই স্বৈরাচারী মনোভাবের যোগ্য জবাব দেবে।"
![]() |
| আন্দোলনের সামনের সারিতে: সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের প্রতিবাদে নিখিল বঙ্গ শিক্ষক সমিতি (ABTA)-এর ব্যানার হাতে শিক্ষকদের বিক্ষোভ। |
আজকের এই সমাবেশে বক্তারা হুঁশিয়ারি দেন যে, যদি অবিলম্বে শিক্ষকদের চাকরির সুরক্ষা নিশ্চিত করা না হয় এবং বাধ্যতামূলক টেট থেকে অব্যাহতি না দেওয়া হয়, তবে আগামী দিনে আন্দোলন আরও তীব্রতর হবে। সংশ্লিষ্ট সংগঠনগুলো আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি রাজপথের লড়াই চালিয়ে যাওয়ার অঙ্গীকার ব্যক্ত করেন।
সমাবেশে এবিটিএ (ABTA), এবিপিটিএ (ABPTA), বঙ্গীয় শিক্ষক ও শিক্ষাকর্মী সমিতি, বঙ্গীয় প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, সারা বাংলা শিক্ষক সমিতি, সারা বাংলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতি, মাধ্যমিক শিক্ষক সঙ্ঘ এবং প্রাথমিক শিক্ষক সঙ্ঘের প্রতিনিধিরা উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের অভিন্ন দাবি, টেট নিয়ম চালু হওয়ার আগে নিযুক্ত শিক্ষকদের ক্ষেত্রে এই 'ফতোয়া' অবিলম্বে বাতিল করতে হবে এবং রাজ্য ও কেন্দ্র সরকারকে যৌথভাবে শিক্ষকদের চাকরির সুরক্ষা নিশ্চিত করার দায়িত্ব নিতে হবে। অন্যথায় আগামী দিনে আরও বৃহত্তর আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন শিক্ষক নেতারা।


